a তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্প বাংলাদেশকে যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে
ঢাকা শনিবার, ২১ চৈত্র ১৪৩১, ০৫ এপ্রিল, ২০২৫
https://www.msprotidin.com website logo

তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্প বাংলাদেশকে যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে


মুক্তসংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক
শনিবার, ১১ ফেরুয়ারী, ২০২৩, ০৮:২০
তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্প বাংলাদেশকে যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে

ফাইল ছবি

বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর জন্য তুরস্ক সরকার ভূমিকম্পের তীব্রতাকে দায়ী করলেও তুরস্কের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই এর জন্য দায়ী করছেন।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের একটি বহুতল ভবন ধসে ২১ জনের মৃত্যু হয়। তদন্তে দেখা যায়, আটতলা ভবনের ওপরের তিনটি তলা নির্মাণ করা হয়েছিল অবৈধভাবে। কিন্তু ভবনটির মালিকপক্ষ স্রেফ কিছু অর্থ জরিমানা দিয়ে ভবনটি বৈধ করে নিয়েছিল।

তুরস্কের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশে ভবন নির্মাণের সময় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নীতিমালা না মানার পরও জরিমানা দিয়ে ‘ক্ষমা’ পাওয়ার এ সুযোগ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১৯ সালের ভবন ধসের পর চেম্বার অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের চেয়ারম্যান সেমাল গোকচে বলেছিলেন, এর অর্থ হলো আমাদের শহরগুলো, বিশেষত ইস্তাম্বুলকে কবরস্থানে পরিণত করা এবং আমাদের ঘরগুলো থেকে কফিন বের করার পরিস্থিতি তৈরি করা।’ (টার্কিশ সিটিজ কুড বিকাম ‘গ্রেভইয়ার্ডস’ উইথ বিল্ডিং অ্যামনেস্টি, ইঞ্জিনিয়ার্স সে, রয়টার্স, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)

চার বছর যেতে না যেতেই তুরস্কের প্রকৌশলীদের সেই আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হলো। ৬ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ধসে সিরিয়া ও তুরস্কের এক বিশাল অঞ্চল আক্ষরিক অর্থেই কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে তুরস্কের অধিবাসী প্রায় সাড়ে ২০ হাজার।

এই বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর জন্য তুরস্ক সরকার ভূমিকম্পের তীব্রতাকে দায়ী করলেও তুরস্কের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই এর জন্য দায়ী করছেন। ইস্তাম্বুলের বোগাজিচি ইউনিভার্সিটির কান্দিলি অবজার্ভেটরি অ্যান্ড আর্থকোয়েক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুস্তাফা এরদিক আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো যথাযথ মান বজায় রেখে ভবন নির্মাণ না করা।’

তুরস্কের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের উচিত হবে অবিলম্বে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্বল অবকাঠামোর ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোর সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেওয়া, নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে কি না, তার তদারকি নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি ও তার নিয়মিত ড্রিল করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ পরিষেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্পসহনীয় করা।

অথচ আনাতোলিয়ান ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় তুরস্ক মারাত্মক ভূমিকম্পপ্রবণ একটি অঞ্চল। এর আগে ১৯৯৯ সালে দেশটির উত্তর-পশ্চিমে ইজমিত অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির শিকার তুরস্কে ভবন নির্মাণে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়, যার সর্বশেষ সংস্করণটি করা হয় ২০১৮ সালে। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং সময়-সময় জরিমানার বিনিময়ে ক্ষমার ব্যবস্থা থাকায় তুরস্কের পুরোনো ভবনগুলোকে যেমন ভূমিকম্পসহনীয় করা হয়নি, তেমনই নতুন নির্মিত অনেক ভবনও ভূমিকম্পপ্রতিরোধী করে নির্মিত হয়নি।

বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু পুরোনো ভবনই নয়, এমনকি সদ্য নির্মিত অনেক ভবনও ভূমিকম্পে ধসে গেছে, যা এসব ভবন নির্মাণে অনিয়মকেই নির্দেশ করে। তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় প্রায় ৭৫ হাজার ভবন ওই ক্ষমার আওতায় এসেছিল। (টার্কি আর্থকোয়েক: হোয়াই ডিড সো মেনি বিল্ডিংস কলাপস?, বিবিসি, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)

তুরস্কের ক্ষমতাসীন এরদোয়ান সরকার বরাবরের মতো ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জরিমানার বিনিময়ে বিল্ডিং কোড ভঙ্গ করে নির্মাণ করা ভবনের বৈধতা দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। সে সময় জরিমানার বিনিময়ে ক্ষমার জন্য ১ কোটি আবেদন জমা পড়ে, যার মধ্যে থেকে ১৮ লাখ আবেদন মঞ্জুর করা হয়। ভবন নির্মাণে অনিয়মকে এভাবে ক্ষমা করে ২০১৯ সাল নাগাদ তুরস্ক সরকারের আয় হয় ৩১০ কোটি ডলার। (টার্কিশ সিটিজ কুড বিকাম ‘গ্রেভইয়ার্ডস’ উইথ বিল্ডিং অ্যামনেস্টি, ইঞ্জিনিয়ার্স সে, রয়টার্স, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)

তুরস্কে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও ভূমিকম্পে বিপুল হতাহতের এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তুরস্ক-সিরিয়ার মতো বাংলাদেশও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, সিলেট সীমান্তে সক্রিয় ডাউকি ফল্টের অবস্থান ও টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টের অবস্থান এবং উত্তর-পূর্বে সীমান্তসংলগ্ন ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল হওয়ায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ১৮৭০ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত বড় আকারের বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে এ অঞ্চলে। পরবর্তী সময়ে ছোট ছোট কিছু ভূমিকম্প হলেও বড় মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হয়নি।

তবে গত ১০০ বছরে বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় ছোট কম্পনগুলো শক্তি সঞ্চয় করে সামনে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করছেন ভূতত্ত্ববিদেরা। বাংলাদেশে তুরস্কের মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বিশেষত রাজধানী ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ভবনগুলোর কত শতাংশ টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বাংলাদেশে ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা থাকলেও ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে মেনে না চলার অভিযোগ বহুদিনের। আর আইন মেনে চলতে বাধ্য করবার ব্যাপারে নগরকর্তৃপক্ষের গাফিলতিও সুবিদিত,তারা মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও নিয়মিত তদারকির অভাবে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সূত্র ধরে বণিক বার্তা জানাচ্ছে, দেশের শহরাঞ্চলের নির্মাণ করা ও নির্মাণাধীন ৬০ শতাংশ ভবনই তৈরি হচ্ছে বা হয়েছে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে।

এর মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর আওতাধীন ভবনের ৬৫.০৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ২৮.৫৭ শতাংশ, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৫৩.৬৯ শতাংশ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৬৭.৯৬ শতাংশ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ২৫.৩৭ শতাংশ এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ভবনের ২৪.৫৩ শতাংশ ভবন নানা ধরণের নিয়ম ভঙ্গ করে তৈরী।

ভবন নির্মাণে অনিয়মের মধ্যে রয়েছে অনুমোদিত উচ্চতার বেশি উঁচু ভবন নির্মাণ, নকশার বাইরে গিয়ে ভবন সম্প্রসারণ, আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা না রাখা, যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখা ইত্যাদি। (শহরাঞ্চলের ৬০% ভবন নির্মাণে নিয়মের ব্যত্যয়, ২০ জানুয়ারি ২০২২, বণিক বার্তা) এভাবে অনিয়মের মাধ্যমে নির্মিত ভবনগুলো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারাত্বক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) কর্তৃক ২০০৯ সালে তৈরি একটি রিপোর্ট অনুসারে, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৯২ শতাংশ এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব নগরে পুরোপুরি ভেঙে পড়া ভবনের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২ লাখ ৩৮ হাজার, ১ লাখ ৪২ হাজার এবং ৫০ হাজার। ঢাকায় ৭৪৮টি পানির পাম্প, ৭টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ৫৪ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা, চট্টগ্রামে ৭২টি পানির পাম্প, ২২টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ২৮ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা ও সিলেটে ১৮টি পানির পাম্প, ১টি গ্যাস কম্প্রেসর স্টেশন এবং ৯ হাজার বৈদ্যুতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ঢাকায় পানির পাইপে ১ হাজার ১৬টি ও গ্যাস পাইপে ৬৮৪টি স্থানে, চট্টগ্রামে পানির পাইপে ৭২৭টি ও গ্যাস পাইপে ২২৯টি স্থানে এবং সিলেটে পানির পাইপে ১২২টি ও গ্যাস পাইপে ৯৭টি স্থানে লিকেজ বা ছিদ্র তৈরি হবে। এ ছাড়া ঢাকায় ১০৭টি, চট্টগ্রামে ৩৬টি এবং সিলেটে ১৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সিট পাওয়া যাবে ঢাকায় মোট সিটের ১২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৪ শতাংশ এবং সিলেটে ১ শতাংশেরও কম। রাত দুইটায় ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মৃতের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২ লাখ ৬০ হাজার, ৯৫ হাজার ও ২০ হাজার।

আর বেলা দুইটায় ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মৃতের সংখ্যা হবে যথাক্রমে ১ লাখ ৮৩ হাজার, ৭৩ হাজার ও ১৪ হাজার। (সূত্র: আর্থকোয়েক রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট অব ঢাকা, চিটাগং অ্যান্ড সিলেট সিটি করপোরেশন এরিয়া, কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম, ২০০৯, পৃষ্ঠা xi- xiii)

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির এই রিপোর্ট তৈরির পর এক যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এ সময়ে নিয়ম না মেনে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা আরও বেড়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতির কোনো অগ্রগতি নেই। পুরোনো ভবনগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেই, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নকশা মানা হচ্ছে কি না এবং রড, সিমেন্ট, বালুর যথাযথ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা-ও দেখার কেউ নেই।

এ অবস্থায় ঢাকায় সাতের বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তো ধ্বংস হবেই, সেই সঙ্গে নিয়ম না মেনে ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি নতুন ভবনও ধসে পড়বে। রানা প্লাজা ধস-পরবর্তী অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে ভূমিকম্পে বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ হলে আমাদের উদ্ধার তৎপরতার সামর্থ্য কত সীমিত। এ অবস্থায় ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষকে উদ্ধার, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা নিয়ে কেমন অসহনীয় একটা পরিস্থিতি হবে, তা অনুমান করাও কঠিন।

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি রাজনৈতিক। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ভূমিকম্পে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।

তুরস্কের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের উচিত হবে অবিলম্বে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের দুর্বল অবকাঠামোর ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোর সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেওয়া, নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে কি না, তার তদারকি নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা ও চিকিৎসার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি ও তার নিয়মিত ড্রিল করা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ পরিষেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্পসহনীয় করা।

দুর্বল অবকাঠামোর ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি, বড় আকারের ভূমিকম্প নিয়মিত হয় না বলে ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতিতে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। সূত্র: প্রথম আলো

লেখক:  কল্লোল মোস্তফা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক লেখক। ই-মেইল: kallol_mustafa@yahoo.com

 

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম

বিপ্লবের মধ্যে দেশ স্বাধীন হলেও দেশ পূনর্গঠনে অপেক্ষা করছে আরো বিপ্লব!


মুক্তসংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক
রবিবার, ২৩ ফেরুয়ারী, ২০২৫, ০৩:০৯
বিপ্লবের মধ্যে দেশ স্বাধীন হলেও দেশ পূনর্গঠনে অপেক্ষা করছে আরো বিপ্লব!

সংগৃহীত ছবি

 

পরিবর্তনের জন্য বিপ্লব যেমন সরকার পরিবর্তন করে, তেমনি সমাজ পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। কিন্তু ১৯৭১-পরবর্তী সময়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সেই বিপ্লব জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তারা দেশের মানুষের প্রতি তাদের অঙ্গীকার ভুলে গিয়েছিল।  

বাংলাদেশে অতীতে কয়েকটি বিপ্লব ঘটেছে, তবে আজ পর্যন্ত জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। ১৯৭৫ সালের আগস্ট বিপ্লব শেখ মুজিবের একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটালেও, তার লক্ষ্য সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হয় এবং ইতিহাসে এটি অসমাপ্ত বিপ্লব হিসেবে পরিচিত হয়ে যায়। কিন্তু ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এ সংঘটিত সৈনিক-জনতা বিপ্লব জাতিকে রক্ষা করেছিল এবং জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় এনেছিল।  

সৈনিক-জনতা বিপ্লবের ফসল জিয়াউর রহমান সময়ের উপযুক্ত নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। সেই সংকটময় মুহূর্তে তিনি জাতিকে রক্ষা করেন এবং দেশকে সঠিক পথে ফেরান। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে থেকেও তিনি দেশকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যান এবং আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তোলেন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা তাকে হারাই।  

অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদী রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমানের উত্থানের ফলে ভারত বাংলাদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি মিশনে নামে। ১৯৮১ সালের মে মাসে, তাদের স্থানীয় সামরিক এজেন্টদের মাধ্যমে ভারত এই মিশনে সফল হয়।  

এরপর জাতি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে, এবং কয়েক মাসের মধ্যে এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। তিনি ভারতপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও, তার শাসনামলে বিশাল অবকাঠামো উন্নয়ন সাধিত হয়। তবে, তিনি গণতান্ত্রিক চর্চাকে ধ্বংস করেন এবং তার শাসনামলে সমাজে ব্যাপক দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের গণঅভ্যুত্থলের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।  

২০০৬ সালের শেষ পর্যন্ত দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা চলমান ছিল, কিন্তু পরে মঈনউদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকার ভারত-আমেরিকা জোটের সমর্থনে ক্ষমতায় আসে। এই সরকার শাসন পরিচালনায় ব্যর্থ হয় এবং ২০০৮ সালে ভারতের নির্দেশে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়।  

এরপর ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে এবং ঐতিহাসিক বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এই ঘটনাটি জাতির জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করে।  

শেখ হাসিনা ভারতের প্রকাশ্য সমর্থনে তার পিতার মতোই ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করতে সম্ভাব্য সবকিছু করেন। বিএনপি ও জামাতের নেতাকর্মীরা তার শাসনামলে চরম নির্যাতন ও দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়। কিন্তু তারা পরিবর্তনের আশা ছাড়েনি এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।  

বিএনপি ও জামাত জনগণের সহানুভূতি অর্জন করলেও, তারা শেখ হাসিনার পতনের জন্য কার্যকর কোনো পথ বের করতে পারেনি। তবে, তারা পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সফল হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বিএনপি ও জামাতের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফলে সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশের জনগণ বহুদিন ধরে পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিল এবং ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দেয়।  

জাতি সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন। বিশেষত, ছাত্রনেতারা, যাদের অনেকেই শিবিরের সদস্য ছিলেন, বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিপ্লবের মোড় ঘুরে যায় যখন শিবির কর্মী আবু সাইয়েদ স্বেচ্ছায় দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। এই আত্মত্যাগ আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে। শানতা, ওয়াসিম, সাকিব তামিম, মুগ্ধ, রুদ্র, শাকিল, নায়িমা ও সুমাইয়া সহ আরও অনেকে আবু সাইয়েদের পথ অনুসরণ করেন এবং জীবন উৎসর্গ করেন, যার ফলে বিপ্লব সফল হয়।  

কয়েকশো মানুষের জীবন ও কয়েক হাজার মানুষের সীমাহীন কষ্টের বিনিময়ে জুলাই বিপ্লব সফল হয়। ছাত্রনেতারা বিপ্লবের প্রধান কারিগর হলেও, বিএনপি, জামাত, ইসলামপন্থী শক্তি এবং সাধারণ জনগণও এই বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যদি কোনো গোষ্ঠী এককভাবে এই বিজয়ের দাবি করে, তাহলে তা বিভেদ সৃষ্টি করবে এবং দেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দেবে।  

একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরিবর্তে জাতীয় বিপ্লবী সরকার গঠন করা উচিত ছিল, কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ভুলভাবে নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। অধ্যাপক ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি জাতীয় বিপ্লবী সরকার গঠন করা যেতে পারে, যেখানে সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে।  

এটি সুস্পষ্ট যে বিএনপি ও জামাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করতে যাচ্ছে এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (KUET) সাম্প্রতিক ঘটনা এর অন্যতম উদাহরণ। যখন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপ্লবকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারত, তখন তাদের মধ্যে এই বিভেদ অত্যন্ত অনভিপ্রেত।  

বিএনপি ও জামাত উভয়েরই মনে রাখতে হবে যে, এই দ্বন্দ্ব কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না, বরং উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এখন বিএনপির নেতৃত্বে চলতে হবে এবং জামাতকে তাদের সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, একইভাবে ছাত্র সংগঠনগুলোকেও সংযত থাকতে হবে। বিএনপিকে বাদ দেওয়ার জন্য কোনো গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে তা জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।  

বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত জাতীয়তাবাদী শক্তি, যার অতীতের রেকর্ড রয়েছে, যদিও ভুলত্রুটি তারা করেছে। জামাতও বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য ইসলামী শক্তি, তবে তাদের জন্য এখনো উপযুক্ত সময় আসেনি, এবং তারা যদি অতিসত্বর ক্ষমতা প্রত্যাশা করে, তাহলে তা দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছুই হবে না।  

বিপ্লব থেকে এখনই সরাসরি রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে তারা পূর্বের মতই ‘অ্যান্টি-লিবারেশন’ অপবাদে আক্রান্ত হতে পারে।  

দোষারোপের রাজনীতি এখনই বন্ধ করতে হবে। বিভাজন মানে শত্রুর জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া, যাতে তারা দুই পক্ষের একটিকে ব্যবহার করে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে হস্তক্ষেপ করতে পারে। বিএনপি ও জামাতের উভয় পক্ষের মধ্যেই কিছু ব্যক্তি আওয়ামী লীগের মদদপুষ্ট হয়ে এই দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করছে।  

সকল পক্ষকে এখন বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের সাথে কাজ করতে হবে। জুলাই বিপ্লব এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

 

লেখক: কর্নেল(অব.) আকরাম

অধ্যাপক ও কলাম লেখক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম

হুথিরা আবারও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে মিসাইল হামলা চালিয়েছে


আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
বুধবার, ০৩ জানুয়ারী, ২০২৪, ১১:২০
হুথিরা আবারও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে মিসাইল হামলা চালিয়েছে

ছবি সংগৃহীত

লোহিত সাগরে আবারও বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই তথ্য জানিয়েছে।

সেন্টকম জানায়, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে নয়টার দিকে লোহিত সাগরে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে দুটি জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে হুথিরা। গত ১৯ নভেম্বরের পর থেকে হুথিদের জাহাজে হামলার এটি ২৪তম ঘটনা।

সেন্টকম আরও জানায়, “হুথিদের এসব কর্মকাণ্ডগুলো কয়েক ডজন নিরীহ ও বেসামরিক নাবিকের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। সেই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ।” সূত্র: আল জাজিরা

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন / কে. আলম
Share on Facebook

মুক্তসংবাদ প্রতিদিন এর সর্বশেষ

সর্বশেষ - মতামত