বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
লাইফস্টাইল

আইনের তকমা গায়ে লাগিয়ে ‘প্রেমের ফাঁদ’, কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই জান্নাতের নেশা!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ১১ মার্চ ২০২৬ ১১:১০ এ.এম

আফরোজা আক্তার জান্নাত (২৫)

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: আইন বিভাগে পড়াশোনা করছেন। লক্ষ্য হয়তো ছিল মানুষের অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু সেই আইনের জ্ঞানকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এক ভয়ংকর ‘হানিপ ট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ পেতেছেন আফরোজা আক্তার জান্নাত (২৫) নামে এক তরুণী। বিত্তবান ডাক্তার, প্রবাসী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের টার্গেট করে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং পরবর্তীতে ভুয়া ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মামলার ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তার পেশা।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য: বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আফরোজা আক্তার জান্নাত ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ থানার বেগুনগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিমের মেয়ে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর গ্রীন মডেল টাউনের পাশে একটি ফ্ল্যাটে একাকী বসবাস করেন এবং রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

শিকার যখন চিকিৎসক ও প্রবাসী: অনুসন্ধানে জান্নাতের প্রতারণার একাধিক শিকারের খোঁজ পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে ডাক্তার মো. জিল্লুর রহমান সুমনের (৪৩) সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন জান্নাত। শারীরিক সম্পর্কের পর বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদার ভয় দেখিয়ে ২০২১ সালের ২৪মে মাসে ২০ লক্ষ টাকা কাবিনে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। বিয়ের একদিন পরেই ২৫ মে ২০২১ ইং৷ শুরু হয় ডিভোর্স ও মোহরানা আদায়ের খেলা। টাকা দিতে অস্বীকার করায় জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন জান্নাত (মামলা নং- ২৯৮/২০২১)। পরবর্তীতে ৮ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে জিল্লুর রহমান মুক্তি পান।

একইভাবে ২০২২ সাল থেকে আমেরিকা প্রবাসী চিকিৎসক মো. কামরুল ইসলামকে (৪৫) প্রেমের জালে জড়ান জান্নাত। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত কয়েক বছরে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে কামরুল ইসলামের কাছ থেকে ১০-১২ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এছাড়াও প্রতি মাসে হাত খরচ বাবদ নিতেন ১০-১৫ হাজার টাকা। কামরুল ইসলাম জানান, এখনো তাকে নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও আইনজীবীরাও রেহাই পাচ্ছেন না: মুগদা এলাকার এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ী (ছদ্মনাম আকাশ) জান্নাতের প্রতারণার শিকার হয়ে বর্তমানে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৯ মে মুগদা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(ক) ও ৩১৩ ধারায় মামলা করেন জান্নাত, যা বর্তমানে বিচারাধীন। এমনকি হাইকোর্টের এক আইনজীবীকেও একইভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন এই তরুণী।

এলাকাবাসীর অভিযোগ: রাজধানীর মান্ডা, আনন্দনগর ও গ্রীন মডেল টাউন এলাকায় জান্নাতের চালচলন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, জান্নাত তার বাসায় প্রায়ই গভীর রাতে বিভিন্ন পুরুষকে নিয়ে আসতেন। একবার এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ (এসআই) তাকে স্থানীয়রা আটকও করেছিল। জান্নাতের নিজ গ্রাম পীরগঞ্জের সাবেক ইউপি সদস্যের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জান্নাত এলাকায় আগে থেকেই এ ধরনের অনৈতিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আইনজীবীদের অভিমত: আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের ছাত্রী হওয়ায় জান্নাত খুব ভালো করেই জানেন কোন ধারায় মামলা করলে দ্রুত টাকা আদায় করা সম্ভব। মূলত আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করেই তিনি একের পর এক সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আফরোজা আক্তার জান্নাতের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই ভয়ংকর প্রতারক চক্রের মূল হোতাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। উল্লেখ তার সাথে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।