শনিবার ২৯ আগষ্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
গণমাধ্যম

গণভোটের রাজনীতি ও সংসদের ওয়াকআউট: বিরোধিতা কি যুক্তির পথে?

গণভোটের, রাজনীতি, সংসদের ওয়াকআউট

নিজস্ব প্রতিনিধি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদের বক্তব্য ঘিরে বিরোধীদের প্রতিবাদের পর সন্ধ্যায় আবারও ওয়াকআউট করেন বিরোধী সদস্যরা। তবে ওয়াকআউটের তাৎক্ষণিক কারণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে দুটি বিষয় এসেছে—বিরোধীরা গণভোটের রায় ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি তুলেছেন; পাশাপাশি বেসরকারি সদস্যদের নির্ধারিত দিনে সরকারি বিল তোলার বিরোধিতার কথাও তাঁরা বলেছেন।

ঘটনাটি নতুন সংসদে সরকার-বিরোধী সম্পর্কের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিরোধিতা কি সংসদের ভেতরে যুক্তি দিয়ে হবে, নাকি ওয়াকআউটই হবে প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র?

বিরোধী দলের অভিযোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। গণভোটের রায়, সাংবিধানিক সংস্কার ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি নিয়ে তাদের আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু সংসদের ভেতরে থেকে প্রশ্ন, পাল্টা যুক্তি ও ভোটের মাধ্যমে অবস্থান স্পষ্ট করাই তো সংসদীয় রাজনীতির মূল পদ্ধতি। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে—সংসদ কি বিতর্কের জায়গা, নাকি প্রতিবাদের মঞ্চ?

সংসদ যদি বিতর্কের জায়গা হয়, তাহলে সরকারের একজন মন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্যের জন্য প্রশ্ন করা হবে, পাল্টা যুক্তি দেওয়া হবে, প্রয়োজনে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি উঠবে এবং সংসদের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়ে দিতে না পেরে যদি সংসদ ত্যাগ করাই প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি শুধু সরকারের নয়; ক্ষতি হয় সংসদীয় গণতন্ত্রের।

গণভোটের প্রশ্নে সংসদের ভূমিকা। গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিরোধই এখন মূল রাজনৈতিক সংঘাত। বিরোধী দল পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি তুলছে; সরকার সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এগোতে চাইছে। আজকের ওয়াকআউটের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাহেবও এই আপত্তি তুলে ধরেন।

প্রশ্ন হলো- সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনটি? সংসদে গিয়ে আপত্তি জানানো, নাকি সংসদ থেকে বেরিয়ে আপত্তি জানানো?

বিরোধী দল যদি মনে করে সরকারের প্রস্তাব ভুল, তাহলে সংসদীয় কমিটিতে গিয়ে সেটি প্রমাণ করার সুযোগই তো সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র। কারণ সেখানে বক্তব্য রেকর্ড হয়, যুক্তি পরীক্ষা হয় এবং জনগণও দেখতে পায়—কে কী চায়। বাইরে আন্দোলন করা গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু সংসদে উপস্থিত থেকে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া সংসদ সদস্যের দায়িত্ব।

কেউ যদি গণভোটের ফলাফলকে নিজের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার একমাত্র বৈধতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, কিন্তু সেই ফল বাস্তবায়নের সাংবিধানিক পদ্ধতি নিয়ে সংসদীয় আলোচনায় অংশ না নেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—তাঁরা কি সত্যিই সমাধান চান, নাকি রাজনৈতিক ইস্যুটিকে দীর্ঘায়িত করতে চান?

কথার জবাব হবে কথা দিয়ে। আজকের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়েরও একটি শিক্ষা আছে- কথার জবাব কথা দিয়ে দেওয়াই রাজনৈতিক পরিপক্বতা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি ছিল; স্পিকারও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সদস্যদের বক্তব্য শেষ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পরে ওয়াকআউট নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কথায় কথায় সংসদ থেকে বেরিয়ে গেলে গণতন্ত্রের ক্ষতি হবে।

ওয়াকআউট সংসদীয় প্রতিবাদের স্বীকৃত পদ্ধতি। কিন্তু ঘনঘন ওয়াকআউট হলে তা প্রতিবাদের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। জনগণের অর্থে পরিচালিত সংসদের প্রতিটি মিনিট তাই মূল্যবান। নিয়মবহির্ভূত ওয়াকআউটের ক্ষেত্রে দলীয় বক্তব্যের সময় কমানোর মতো বিধি নিয়ে আলোচনা হতে পারে—প্রতিবাদের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই।

নতুন সংসদ সদস্যদের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত শোরগোল নয়—তথ্য, যুক্তি ও প্রশ্ন। সরকার ভুল করলে কঠিন প্রশ্ন, আর ভালো করলে বিকল্পসহ আরও ভালো করার প্রস্তাব—এটাই দায়িত্বশীল বিরোধিতার পরিচয়।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান—দুটিই বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোনো একটি রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য ইতিহাসকে আড়াল করা উচিত নয়। ইতিহাস দলীয় সম্পত্তি নয়; এটি জাতির সম্পদ।

আজকের ঘটনা সরকার ও বিরোধী—দুই পক্ষের জন্যই সতর্কবার্তা। সরকারের দায়িত্ব সংসদকে কার্যকর রাখা; বিরোধী দলের দায়িত্ব বিরোধিতাকে যুক্তিনির্ভর রাখা। সংসদ থেকে বেরিয়ে প্রতিবাদ করা সহজ; সংসদের ভেতরে দাঁড়িয়ে তথ্য-যুক্তি দিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত বদলানোই কঠিন—আর সেটিই প্রকৃত সংসদীয় রাজনীতি।

জনগণ শুধু প্রতিবাদ নয়, ফলাফল দেখতে চায়—কে প্রশ্ন করছে, কে জবাব দিচ্ছে এবং কে সমাধান দিচ্ছে। তাই সরকারের সহনশীলতা ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীলতা—দুটিই জরুরি। বিরোধিতা হোক সরকারের ভুলের বিরুদ্ধে, সংসদের কার্যকারিতার বিরুদ্ধে নয়।


লেখক: মোহাঃ খোরশেদ আলম
         সাংবাদিক ও কলাম লেখক ও

      বার্তা সম্পাদক: ঢাকানিউজ২৪ ডটকম/ সাপ্তাহিক দেশের ডাক

 

 

আরও খবর

news image

গণভোটের রাজনীতি ও সংসদের ওয়াকআউট: বিরোধিতা কি যুক্তির পথে?

news image

বৃহত্তর ময়মনসিংহ কর আইনজীবী সমিতি-ঢাকার কার্যনির্বাহী পরিষদ ২০২৬–২০২৭-এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত

news image

অসহায় স্ত্রী- শারমিন চৌধুরী সন্তানদের বাচাঁতে সরকারের সহায়তা চেয়ে সাংবাদিক সম্মেলন

news image

হেলথ প্রমোশনে সমন্বিতভাবে কাজ করার লক্ষ্যে কুয়েট ও ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত

news image

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬ এ রোহিঙ্গা এবং হোস্ট কমিউনিটির প্রতি মর্যাদা ও সম্মান আহ্বান

news image

মালয়েশিয়া সফর: বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন

news image

চোর পলাশকে ধরিয়ে দিতে পারলে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা

news image

সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর: তথ্যমন্ত্রী

news image

সম্পাদক পরিষদ নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক