শক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বার ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
জাতীয়

শুধু ভাষণ নয়, বাংলাদেশের স্বার্থের বার্তা নিয়ে নিউইয়র্কে তারেক রহমান: জাতিসংঘের মঞ্চে আজ বাংলায় বলবেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘের মঞ্চে আজ বাংলায় বলবেন প্রধানমন্ত্রী

খোরশেদ আলম: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন মানেই বিশ্বনেতাদের সামনে একটি আনুষ্ঠানিক ভাষণ- এমন ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। বর্তমান বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের জন্য এ ধরনের আন্তর্জাতিক সমাবেশ একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর তাঁর কর্মসূচিতে রয়েছে একাধিক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনা।

প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের কর্মসূচি দেখলে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা, জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় উঠে আসবে।

বৈঠকের টেবিলেই জাতীয় স্বার্থের হিসাব: নিউইয়র্কে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকগুলোকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই দেখা যায়। ভুটান, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গেও বৈঠকে বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক আলোচনায় এসেছে।

অর্থনৈতিক কূটনীতিও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নিয়ে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ নিউইয়র্ক সফরকে শুধু একটি বক্তৃতার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। বক্তৃতা হবে বিশ্বমঞ্চে; কিন্তু তার আগে ও পরে যে বৈঠকগুলো হয়, সেখানেই অনেক সময় ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়।

রোহিঙ্গা সংকটেও বাংলাদেশের অবস্থান: বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোর একটি রোহিঙ্গা সংকট। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনায় এই সংকটের টেকসই সমাধান এবং নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

আজ রাত ৩টায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠ: সব আলোচনা ও বৈঠকের পর আজকের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায়, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৩টায় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন। তিনি বাংলায় বক্তব্য দেবেন এবং বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতির কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন বলে জানানো হয়েছে।

এই ভাষণের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন।

বাংলা ভাষায় দেওয়া এই বক্তব্যে তাই শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠ নয়, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, প্রত্যাশা ও জাতীয় স্বার্থের কথাই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার প্রত্যাশা রয়েছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আবেগের চেয়ে ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। কোন বৈঠক থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে, কোন আলোচনা থেকে কতটা বিনিয়োগ বা বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি হয়, রোহিঙ্গা সংকটে কতটা আন্তর্জাতিক চাপ ও সহযোগিতা পাওয়া যায়, জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত হয়- শেষ পর্যন্ত এসব ফলাফলই একটি আন্তর্জাতিক সফরের বাস্তব মূল্যায়নের ভিত্তি তৈরি করে।

নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক বৈঠকগুলো সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ। জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার বাইরে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সরাসরি আলোচনা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজ বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় বক্তব্য দেবেন, তখন বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকবে- বিশ্ববাসীর সামনে দেশের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে এবং জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শান্তি ও জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান উপস্থাপন করা হবে।

কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের মর্যাদা শুধু বক্তৃতায় নয়; সেই বক্তৃতার সঙ্গে কতটা কূটনৈতিক যোগাযোগ, কতটা জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব এবং পরবর্তীতে কতটা বাস্তব ফলাফল যুক্ত হয়, তার ওপরও নির্ভর করে।

নিউইয়র্কে আজকের ভাষণ তাই একà