বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গাব্দ
আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের চীন সফর, ইরান সংকট ও বদলে যাওয়া বিশ্ব ভূ-রাজনীতির হিসাব

ট্রাম্পের চীন সফর, ইরান সংকট ও বদলে যাওয়া বিশ্ব ভূ-রাজনীতির হিসাব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং

মোহা: খোরশেদ আলমঃ বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্য আর কেবল তেল বা সামরিক শক্তির অঞ্চল নয়; এটি এখন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ইসরাইল নির্ভর কৌশল, ইউরোপীয় মিত্রদের অনীহা এবং চীনের নীরব কিন্তু কৌশলী অগ্রযাত্রা—সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই “শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি”-তে বিশ্বাসী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামরিক শক্তি সবসময় কূটনৈতিক সফলতা নিশ্চিত করে না। ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় ওয়াশিংটন যেভাবে দ্রুত ফলাফল প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার উল্টো চিত্রই তুলে ধরেছে। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা, জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর দ্বিধান্বিত অবস্থান আমেরিকার কৌশলগত সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করেছে।

বিশেষভাবে হরমুজ প্রণালীর প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়া মানেই শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়া। বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকা ও ইসরাইলের চাপ মোকাবিলার মধ্য দিয়েই ইরান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করার সুযোগ পেয়েছে। আর এই বাস্তবতাকে খুব ঠান্ডা মাথায় পর্যবেক্ষণ করছে সি চিন পিং নেতৃত্বাধীন চীন।

চীনের কৌশল বরাবরই সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের দিকে। বেইজিং খুব ভালো করেই জানে, মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক জড়িত হওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং অর্থনীতি, জ্বালানি, অবকাঠামো ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করাই অধিক কার্যকর। ইরান সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দরজাগুলোর একটি প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।

এখানেই ট্রাম্পের চীন সফরকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—এই সফর কি আদৌ ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারবে?

বাস্তবতা বলছে, সম্ভাবনা খুবই সীমিত। কারণ বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তারা আর কেবল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি নয়; বরং বিকল্প বিশ্ব নেতৃত্বের দাবিদার। তাই আমেরিকার দুর্বল মুহূর্তে বেইজিং কোনো আবেগী সমঝোতার পথে হাঁটবে—এমনটা ভাবা রাজনৈতিক সরলতা ছাড়া কিছু নয়। বরং চীন পরিস্থিতিকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধায় ব্যবহার করার দিকেই বেশি মনোযোগ দেবে।

এখানে ঐতিহাসিক “থুসিডিডিস ট্র্যাপ”-এর প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলে, যখন একটি উদীয়মান শক্তি প্রতিষ্ঠিত শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে, তখন সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক অনেকটাই সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তবে পার্থক্য হলো—চীন সরাসরি সংঘাতে নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ধৈর্যের মাধ্যমে এগোতে চায়। অন্যদিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অনেক সময় তাৎক্ষণিক শক্তি প্রদর্শনকে অগ্রাধিকার দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে।

ইউরোপের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত এখনো ইউরোপ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহৎ সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ব্যাপারে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো অত্যন্ত সতর্ক। এ কারণেই ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত একক সমর্থন দেখা যাচ্ছে না। বরং ইউরোপ এখন অনেক ক্ষেত্রেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দিকে ঝুঁকছে।

সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে একমেরু বাস্তবতা থেকে বহুমেরু বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। এই পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কে কতটা ধৈর্য, দূরদর্শিতা ও কৌশলী ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। এই জায়গায় চীন বর্তমানে অনেক হিসাবি ও দীর্ঘমেয়াদি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তিনি কি বিশ্বকে কেবল শক্তির ভাষায় পরিচালনা করতে চাইবেন, নাকি নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্যের দিকে ফিরবেন? কারণ আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, একক আধিপত্যের যুগ যে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে—তা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

লেখক: অধ্যাপক মোহাঃ খোরশেদ আলম, সাবেক পরিচালক, শিক্ষা বিভাগ ও আউটরীচ ক্যাম্পাস, ডিআইইউ/ সম্পাদক ও প্রকাশক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন।


এই সম্পর্কিত আরও খবর

আরও খবর

news image

চীনা সেনাবাহিনী ঢুকে পড়েছে ভারতের ভূখণ্ডে

news image

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: বাস্তবতা, ভারসাম্য ও ভবিষ্যতের কূটনীতি

news image

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি

news image

ট্রাম্পের চীন সফর, ইরান সংকট ও বদলে যাওয়া বিশ্ব ভূ-রাজনীতির হিসাব

news image

‘হলদে পাহাড়ের গুহা’ থেকে ‘গ্রেট হল’- প্রেসিডেন্ট সির উত্থানের বিস্ময়কর গল্প

news image

ইরানি তেল আমদানিকারক চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছে ট্রাম্প

news image

সামরিক প্রধানের সঙ্গে খামেনির বৈঠকের পর শত্রু মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

news image

হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেই ইরানে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত

news image

আগামী ১লা মার্চ ২০২৬ এগিয়ে চল সংঘের প্রকাশনা মঞ্চের নবম বার্ষিক সাধারণ সভা

news image

যুক্তরাষ্ট্র যে কোন সময় ইরানে হামলা চালাতে পারে