মোহাঃ খোরশেদ আলম, সম্পাদক ও প্রকাশক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন ২২ মে ২০২৬ ০৩:১৬ পি.এম
মোহা: খোরশেদ আলমঃ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, দ্রুত নগরায়ণ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অবক্ষয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনের নানা বাস্তবতা আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন অপরাধ, বিশেষ করে শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এগুলো সমাজ, পরিবার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।
গ্রামবাংলায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা ছিল। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি এলাকায় এলে মানুষ তার পরিচয়, উদ্দেশ্য এবং অবস্থান সম্পর্কে খোঁজখবর নিত। এতে একধরনের সামাজিক নিরাপত্তা তৈরি হতো। কিন্তু বড় শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা ও উপশহরগুলোতে, মানুষে মানুষে সেই যোগাযোগ ও দায়িত্ববোধ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ফলে এক এলাকা থেকে অপরাধ করে অন্য এলাকায় আত্মগোপন করা সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল যুগে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক তথ্যভিত্তিক নাগরিক ব্যবস্থাপনা, ভাড়াটিয়া তথ্য সংরক্ষণ, স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
তবে কেবল আইন দিয়ে সমাজকে সুস্থ রাখা যায় না; প্রয়োজন পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষারও। আমাদের সমাজে এখনও বাল্যবিবাহ, অনিয়ন্ত্রিত বহু বিবাহ, পারিবারিক অবহেলা এবং সন্তানদের প্রতি দায়িত্বহীনতা বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে আছে। অনেক শিশু বাবা-মায়ের স্নেহ, শিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হচ্ছে। ফলে তারা অল্প বয়সেই মাদক, সহিংসতা ও অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে পরিবারকে শক্তিশালী করতে হবে, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আজ দায়িত্বশীলতার বড় অভাব দেখা যাচ্ছে। গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি জনগণের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া। দেশের মানুষ দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং দেশকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং দূরদর্শিতারও বিকল্প নেই। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে শুদ্ধি অভিযান, দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং দলীয়করণের পরিবর্তে যোগ্যতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রের ভেতরে কিংবা বাইরে—যে কোনো গোষ্ঠী যদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, মব সংস্কৃতি উসকে দেওয়া অথবা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আদর্শিক বিভাজন নতুন নয়। কিন্তু কোনো মতাদর্শের নামে সহিংসতা, উগ্রতা বা বিশৃঙ্খলা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রশাসন, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো—সবখানে একটি শান্তিপূর্ণ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নও তখনই টেকসই হবে, যখন রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা থাকবে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি—সবকিছুই নির্ভর করে একটি নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর। তাই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তরুণ সমাজকে বিভাজনের রাজনীতি নয়, দক্ষতা, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও মানবিক নেতৃত্বের পথে এগিয়ে নিতে হবে।
সবশেষে, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের সবার মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু সরকার নয়, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, পরিবার, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং তরুণ প্রজন্ম—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। ন্যায়বিচার, মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে যদি আমরা নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারি, তবে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া অবশ্যই সম্ভব।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। তাই এখনই সময়—বিভাজন নয়, ঐক্যের; প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচারের; বিশৃঙ্খলা নয়, সুশাসনের পথে এগিয়ে যাওয়ার।
লেখক: মোহাঃ খোরশেদ আলম, সম্পাদক ও প্রকাশক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন
নির্বাহী সম্পাদক, হিউম্যান রাইটস এন্ড এনভায়রমেন্ট ডেভোলপমেন্ট সোসাইটি(হিডস)
রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগে স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনে এখনই সময়
রমজানের এই আয়োজনের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় হবে- জয়রুল আবেদীন ফারুক
স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের পুনর্বহালের দাবি
বাংলাদেশ লেবার পার্টির আলোচনা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত
গণভোটের রায়ের ব্যাপারে গড়িমসি করার ফলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট হওয়ার ঝুঁকি তৈরী হয়েছে
নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নিয়ে মতবিনিময় সভা