আরাফাত আলম, মু্ক্তসংবাদ প্রতিদিন ০৭ জুলাই ২০২৬ ০২:৪৬ পি.এম
নিউজ ডেস্কঃ ভূমি, আকাশ ও সমুদ্র— তিন দিক থেকেই পরমাণু হামলার সক্ষমতা দেখালো চীন। সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরল পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি। পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী সাবমেরিনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের গোপনীয়তা। সমুদ্রের গভীরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে শত্রুর ওপর আকস্মিক হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকায় এসব সাবমেরিনকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। আর এ ধরনের সক্ষমতা নিয়ে চীন বরাবরই কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে এসেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ধারণা, চীনের পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো অন্তত এক দশক ধরে নিয়মিত সমুদ্রে টহল দিয়ে আসছে। তবে এ বিষয়ে বেইজিং এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। গত ৬ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরল পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপ অঞ্চলজুড়ে বিস্ময় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নকল যুদ্ধাস্ত্রসংবলিত ক্ষেপণাস্ত্রটি আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে নিক্ষেপ করা হয় এবং এটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি কোথায় গিয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগেও সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। তবে সেসব পরীক্ষা সাধারণত নিজস্ব উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল এবং প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ২০২৪ সালে চীন নিজেদের ভূখণ্ড থেকে ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। ১৯৮০ সালের পর সেটিই ছিল দেশটির প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকৃত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনো পরিষ্কার নয়। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় এটিও পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি মহড়া হতে পারে। এর মাধ্যমে পূর্ণ সক্ষমতায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই চীন দ্রুত পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তাদের মতে, তাইওয়ান ইস্যু যেকোনো সময় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে দেশটির সক্রিয় যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৬০০ হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সর্বশেষ পরীক্ষায় সম্ভবত ‘জেএল-২’ অথবা ‘জেএল-৩’ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। জেএল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার। এটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে হলে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী এলাকা থেকে উৎক্ষেপণ প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পাল্লার জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্র চীনের উপকূলীয় জলসীমা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম। গত বছর বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সামরিক কুচকাওয়াজে এই দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছিল।
চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক ওয়াং কিয়াং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে দেওয়া এক মন্তব্যে বলেছেন, চলতি বছর কিংবা আগামী বছরের শেষ নাগাদ চীন আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও চালাতে পারে। সেটি সফল হলে ভূমি, আকাশ ও সমুদ্র—এই তিনটি মাধ্যম থেকেই পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করবে বেইজিং। সামরিক পরিভাষায় একে পারমাণবিক ত্রিমুখী সক্ষমতা বলা হয়।
চীন পরীক্ষার আগে অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে আগাম অবহিত করলেও অনেক দেশ এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আঙ্কারায় উত্তর আটলান্টিক জোটের শীর্ষ সম্মেলনের আগে এবং অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পরীক্ষা চালানো হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে।
চীনের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং একে ‘অস্থিতিশীল’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেছেন, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হোক—তা তারা কোনোভাবেই চান না।
বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ভারত এবং উত্তর কোরিয়াও এ ধরনের সাবমেরিন পরিচালনা ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিংয়ের এই শক্তি প্রদর্শন একদিকে এশিয়ায় তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি করছে।
সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট।
আকাশ ও সমুদ্রসহ তিনদিক থেকে পরমাণু হামলার প্রস্তুতি চীনের, বাড়ছে আঞ্চলিক উদ্বেগ
চীনা সেনাবাহিনী ঢুকে পড়েছে ভারতের ভূখণ্ডে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: বাস্তবতা, ভারসাম্য ও ভবিষ্যতের কূটনীতি
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি
ট্রাম্পের চীন সফর, ইরান সংকট ও বদলে যাওয়া বিশ্ব ভূ-রাজনীতির হিসাব
‘হলদে পাহাড়ের গুহা’ থেকে ‘গ্রেট হল’- প্রেসিডেন্ট সির উত্থানের বিস্ময়কর গল্প
ইরানি তেল আমদানিকারক চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছে ট্রাম্প
সামরিক প্রধানের সঙ্গে খামেনির বৈঠকের পর শত্রু মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান
হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেই ইরানে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত
আগামী ১লা মার্চ ২০২৬ এগিয়ে চল সংঘের প্রকাশনা মঞ্চের নবম বার্ষিক সাধারণ সভা
যুক্তরাষ্ট্র যে কোন সময় ইরানে হামলা চালাতে পারে