মোহাঃ খোরশেদ আলম, সম্পাদক ও প্রকাশক, মুক্তসংবাদ প্রতিদিন ১৭ সেপ্টেম্বার ২০২৬ ১০:১৫ এ.এম
ঢাকা প্রতিনিধিঃ ব্যবসায়ী, করদাতা ও কর আইনজীবীদের এনবিআরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এক টাকাও ঘুষ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আহসান হাবিব। সম্প্রতি ঢাকা ট্যাকসেস বার অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক-২০২৬ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘কোনো একজন এনবিআরের কর্মকর্তাকে একটি টাকা ঘুষ দেবেন না। আমি দেখি কে, কিভাবে আপনাদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়।’ একই সঙ্গে করদাতাদের হয়রানি ও অনিয়ম কমাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে করদাতার সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে সম্পূর্ণ পেপারলেস ও ফেসলেস কর ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এনবিআর চেয়ারম্যান স্যারের এই আহ্বানের পর ব্যবসায়ী ও করসংশ্লিষ্ট মহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—শুধু করদাতাকে ঘুষ না দেওয়ার আহ্বান জানালেই কি ঘুষের সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব? নাকি এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে ঘুষ দেওয়ার প্রয়োজন বা সুযোগ দুটিই কমে যায়?
কর আইনজীবী ও ব্যবসায়ী মহলের আলোচনায় উঠে এসেছে, করদাতার কোনো নথিতে অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে অনেক সময় তা নিষ্পত্তির জন্য একাধিক স্তরের কর্মকর্তার কাছে যেতে হয়। এর ফলে করদাতার সময়, অর্থ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় দ্রুত পণ্য খালাসের প্রয়োজন থাকায় দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ব্যবসায়ী ও করসংশ্লিষ্টদের এমন অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্ন উঠছে, যদি একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য করদাতাকে একাধিক টেবিল ও কর্মকর্তার কাছে যেতে হয়, তাহলে সেখানে অনিয়মের সুযোগ কমানোর জন্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটিকেই কেন পুনর্গঠন করা হবে না?
এ প্রসঙ্গে করসংশ্লিষ্ট আলোচনায় কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাবও এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে কর ও কাস্টমস কার্যক্রমের অধিকাংশ ধাপ সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, করদাতার পরিচয় সুরক্ষিত রেখে অভিযোগ জানানোর কার্যকর অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা এবং অভিযোগের স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে সব ধরনের সরকারি রাজস্ব পরিশোধকে স্বচ্ছ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় আনা, রশিদবিহীন লেনদেন বন্ধ করা এবং কর্মকর্তা ও করদাতার অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে ‘ফেসলেস’ সেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
এনবিআর ইতোমধ্যে ২০২৯ সালের মধ্যে পেপারলেস ও ফেসলেস করব্যবস্থার দিকে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ঘরে বসে রিটার্ন দাখিল, নিরীক্ষার জবাব দেওয়া এবং করসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করার কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি আইনি ও প্রশাসনিক জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু অনলাইন ব্যবস্থা চালু করলেই দুর্নীতির সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। কোথায় কর্মকর্তার বিবেচনাধিকার থাকবে, কীভাবে অডিট নির্বাচন হবে, কত দিনের মধ্যে একটি ফাইল নিষ্পত্তি করতে হবে, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করদাতার আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ কী হবে? এসব বিষয়ও স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য করা প্রয়োজন।
করদাতা ও ব্যবসায়ীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো- নিয়মিত রিটার্ন দাখিলকারী ও আইন মেনে চলা প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কর ফাঁকি বা মিথ্যা তথ্যের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকলে সৎ করদাতার ওপর নির্বিচার চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাতেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- প্রযুক্তি, স্বচ্ছতা, স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থা এবং কার্যকর জবাবদিহিকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। শুধু ব্যক্তির সততার ওপর পুরো ব্যবস্থা নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন টেকসই নাও আসতে পারে।
এনবিআরের বর্তমান নেতৃত্বের জন্য তাই বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নয়; একই সঙ্গে এমন একটি কর প্রশাসন গড়ে তোলা, যেখানে করদাতা রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাকে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখবেন, ভয় বা হয়রানির ক্ষেত্র হিসেবে নয়।
‘এক টাকা ঘুষ দেবেন না’- এনবিআর চেয়ারম্যান স্যারের এই আহ্বান নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী বার্তা। কিন্তু সেই বার্তাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ঘুষ না দিয়েও একজন করদাতা তাঁর বৈধ কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারেন।
অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্ব শুধু ঘুষদাতা বা ঘুষগ্রহীতার ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। প্রক্রিয়াটিকেও এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে অনিয়মের সুযোগ কমে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় স্বচ্ছভাবে এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করদাতার আস্থাও বাড়ে।
এটাই হতে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও করদাতাবান্ধব রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পথ।
লেখকঃ
মোহা: খোরশেদ আলম মিঞা
নির্বাহী সম্পাদক, হিউম্যান রাইটস এন্ড এনভায়রমেন্ট ডেভো. সোসাইটি(হিডস)
বার্তা সম্পাদক, ঢাকা নিউজ২৪.কম ও সাপ্তাহিক দেশের ডাক।
‘এক টাকা ঘুষ নয়’ এনবিআর চেয়ারম্যানের আহ্বান: দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজন কাঠামোগত ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার
স্টিল শিল্পে কর-শুল্ক চাপ না কমালে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার শঙ্কা- জাহাঙ্গীর আলম
৬টি বন্ধ চিনিকল চালুর দাবি জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটি
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ জাহাজ মালিকদের বকেয়া প্রদানের দাবিতে মানববন্ধন
ভ্যাটের জালে সব ব্যবসা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে
নিরাপদ খাদ্যে মুনাফা দেখলে চলবে না: এমপি রতন
এনবিএফআই খাতে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ দ্রুত ও পূর্ণ ফেরতের দাবি
আসন্ন কৃষি বাজেট নিয়ে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশন যে প্রস্তাবনা দিল
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসারে পূনঃ পেনশন দাবি করেন গ্রামীণ ব্যাংক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা- কর্মচারীরা
কৃষকদের কল্যাণে ১৩ দফা দাবি জানিয়ে আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য জোট